একসময় প্রবল স্রোত আর জীবন্ত জলধারায় ভরপুর ছিল দোহার উপজেলার কার্তিকপুরের ইছামতী নদী। বর্ষা-বাদলে ফুলে-ফেঁপে ওঠা এই নদী ছিল এলাকার প্রাণ, কৃষি, নৌপথ আর জীবিকার প্রধান উৎস। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই স্রোতস্বিনী ইছামতী আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।
দোহার উপজেলার কুসুমহাটি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হাফেজ আব্দুল ওয়াহাব দোহারী বলেন, এক সময়ের স্রোতস্বিনী ইছামতী নদী আজ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদাসীনতায় বিলুপ্তির পথে। এই নদীর কাছেই প্রবাহিত পদ্মা নদী, কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড স্লুইসগেট স্থাপন না করে অপরিকল্পিতভাবে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভরা বর্ষা মৌসুমেও এখন আর ইছামতী নদীতে আগের মতো পানি থাকে না। নদীকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করা জেলে পরিবারগুলো বর্তমানে চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছে। তিনি চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার জানিয়েছিলেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।নৌকা বাইচ ঐতিহ্য রক্ষা জাতীয় কমিটির প্রধান উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক জেলা ও দায়রা জজ ড. আবুল হোসেন খন্দকার বলেন, এক সময়কার প্রমত্তা ইছামতী এখন যেন কালের সাক্ষী হয়ে নিঃশব্দে হারিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়-যা এলাকাবাসীর জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনের কাছে তিনি দাবি করেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে নদীর কচুরীপানা অপসারণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং খননের মাধ্যমে ইছামতী নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক। অন্যথায় নদী ও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঐতিহ্য চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে খননের অভাব, দখলদারিত্ব এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের কারণে নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও নদীর বুক ভরাট হয়ে গেছে, আবার কোথাও তা পরিণত হয়েছে সরু খালে। শুকনো মৌসুমে অনেক স্থানে হেঁটেই পার হওয়া যায়- একসময় ছিল অকল্পনীয়।
কার্তিকপুরের প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, একসময় এই নদীতে বড় বড় নৌকা চলাচল করতো। মাছের প্রাচুর্য ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রবীণ বাসিন্দাদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে এক ভিন্ন চিত্র। তারা জানান, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই ইছামতী নদীতে জমে উঠতো নৌকা বাইচ। দূর-দূরান্ত থেকে বাইচে অংশ নিতে আসতো নৌকার দল, আর দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠতো পুরো এলাকা।
স্থানীয় বাসিন্দা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিজানুর রহমান টিটু বলেন, বর্ষা এলেই নদীতে নৌকা বাইচ হতো। কী যে আনন্দ ছিল! বাইচকে কেন্দ্র করে গ্রামে উৎসবের আমেজ তৈরি হতো। বাইচের দিন আমাদের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন আসতো। সবাই মিলে নদীর পাড়ে গিয়ে বাইচ দেখতাম। এখন সেই দিনগুলো শুধু স্মৃতি হয়ে আছে।
দোহার- নবাবগঞ্জ সোস্যাল মুভমেন্টের সাংগঠনিক সম্পাদক ও পদ্মা কলেজের প্রভাষক মাহমুদুল হাসান সুমন বলেন, এক সময় পদ্মার পানি কার্তিকপুর ইছামতি নদীতে প্রবাহিত হতো। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মান করায় ইছামতি আজ বিলুপ্তির পথে। নদীটি বাঁচাতে হলে পদ্মার সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে স্লুইচগেট স্থাপন অতীব জরুরি।
স্থানীয় জেলেরা জানান, নদীতে পানি ছিল, স্রোত ছিল তাই বাইচ হতো। এখন নদীই নেই, বাইচ হবে কীভাবে? নৌকা বাইচ শুধু খেলা ছিল না, এটি ছিল আমাদের সংস্কৃতির অংশ। নদী হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ঐতিহ্যও হারিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, ইছামতী নদী পুনরুদ্ধার করা গেলে হয়তো আবার ফিরতে পারে সেই হারানো দিন, ফিরতে পারে নৌকা বাইচের প্রাণবন্ত উৎসব। কিন্তু দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এই ঐতিহ্য চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি। এখন সেই নদীতে নেই স্রোত, নেই মাছ-অধিকাংশ জায়গা জুড়ে কেবলই কচুরিপানা আর ময়লার স্তূপ।
পরিবেশবিদদের মতে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে দ্রুত উদ্যোগ না নিলে ইছামতী সম্পূর্ণভাবে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে। তারা জরুরি ভিত্তিতে নদী খনন, দখলমুক্ত করা এবং নদীর দুই তীর রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
রাশিম মোল্লা
সাধারণ সম্পাদক
নৌকা বাইচ ঐতিহ্য রক্ষা জাতীয় কমিটি
Leave a Reply